ভালো মানুষ কি হারিয়ে যাবে

ভালো মানুষ কি হারিয়ে যাবে

১৬৬২ সালে সর্বশেষ ডোডো পাখিটিকে দেখা যায়।
তারপর এই প্রজাতিটি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।

মরিশাস দ্বীপ।
ভারত মহাসাগরে অবস্থিত এই অত্যাশ্চর্য দ্বীপটি ষোড়শ শতাব্দীর আগেও ঘন লতা-গুল্মে আচ্ছাদিত একটি সমৃদ্ধ বনাঞ্চল ছিল। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ আর গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ দ্বীপটি জীববৈচিত্র্যের অনন্য আধার ছিল সে সময়। বিলুপ্ত ডোডো পাখিদের সর্বশেষ আর হাজার বছরের একমাত্র আশ্রয়স্থলও ছিল এই মরিশাস দ্বীপ।

ধারণা করা হয় উড়তে অক্ষম ডোডোরা সুদূর অতীতে উড়তে পারত, আকারেও ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট। এরা যখন মরিশাস দ্বীপে এসে বাসা বাঁধলো, তারপর থেকে শুরু হয় এদের ক্রম বিবর্তন। এ দ্বীপে ডোডোদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য থাকায় এবং এদেরকে শিকার করে খাওয়ার মতো কোনো শিকারী প্রাণী না থাকায় এরা ধীরে ধীরে সেখানে স্থায়ী হয় আর এক পর্যায়ে উড়তে ভুলে যায়। বিনাশ্রমলব্ধ পর্যাপ্ত খাবার খেয়ে ডোডোরা আকারেও অনেক বড় হয়ে ওঠে।

ফলমূল, কাঁকড়া আর শেলফিশ খেয়ে ডোডোদের দিন ভালোই কাটছিল যতক্ষণ না দ্বীপটিতে সভ্য(?) মানুষদের আবির্ভাব ঘটে। ওলন্দাজদের আগমনের অনেক আগে ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দ্বীপটিতে পর্তুগিজদের আবির্ভাব ঘটে কিন্তু পর্তুগিজদের বর্ণনায় ডোডো পাখির কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। ১৫৯৮ সালে ওলন্দাজদের দ্বীপটি দখলের মধ্যে দিয়ে ডোডো পাখি সম্পর্কে জানতে পারে বহির্বিশ্ব।

ডোডোদের বিশাল আকার-প্রকৃতি দেখে পূর্বতন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন এই পাখিরা উটপাখি কিংবা শকুন জাতীয় পাখির পরিবারভুক্ত। ১৮৪২ সালে একটি ডোডোর খুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা একমত হন যে ডোডো কবুতর পরিবারভুক্ত। খুলিটি বর্তমানে কোপেনহেগেন প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। লন্ডন প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরেও ডোডো পাখির কিছু দেহাবশেষ রক্ষিত আছে। প্রাপ্ত বয়স্ক একেকটি ডোডো ৩ ফুটেরও বেশি উঁচু হতো, এর ওজন হতো ১০-১৭ কেজি আর এরা ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়াতেও পারত। তবে ডোডোরা ছিল খুব নিরীহ শান্তিপ্রিয় পাখি।

ডোডোরা প্রথম যখন ওলন্দাজ নাবিকদের মুখোমুখি হয় তখন এরা নবাগতদের দিকে অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে ছিল, না তাদেরকে আক্রমণ করতে ছুটে গেছে আর না তাদের দেখে ভয়ে দৌড়ে পালিয়েছে। ওলন্দাজ নাবিকরা ডোডোদের এই সরল বিশ্বাস ও বন্ধুভাবকে দুর্বলতা ভাবল আর ডোডোদের ধরে ধরে ইচ্ছেমতো খাওয়া শুরু করলো। এতো সহজ শিকার হয়তো এর আগে তারা আর কোথাও দেখেনি। এক পর্যায়ে গণহারে ডোডো হত্যা শুরু হলো।

একটি ডোডোকে কোনোরকমে দুহাতে ধরতে পারলেই কেল্লা ফতে। ধৃত ডোডোটি চিৎকার শুরু করে দিত আর তার সাহায্যার্থে মুহূর্তে আরো ডোডো জড়ো হয়ে যেত। ফলস্বরূপ সবাই আটক হতো শিকারিদের হাতে। সমাজে লোকে যেমন সৎব্যক্তিদের বোকা ভাবে, ডোডোদেরকেও একারণে ওলন্দাজরা বোকা আর নির্বোধ ভাবত। পর্তুগিজরাও ডোডোদেরকে বোকা বলেই জানত কারণ ডোডো শব্দের পর্তুগিজ বুৎপত্তিগত অর্থ হলো বোকা বা নির্বোধ। প্রকৃত বিচারে ডোডোদের ছিল স্বজাতির বিপদে এগিয়ে আসার মতো মানবিক গুণ আর ওলন্দাজ নাবিকদের ছিল নিরীহ সরল বিশ্বাসী ডোডোদের নির্বিচারে হত্যা করার মতো পাশবিক নিষ্ঠুরতা।

একজন ভালো মানুষকে যে কোনোভাবে চুপ করাতে পারলেই খারাপরা হয়তো সাময়িকভাবে জয়ী হয়!
কিন্তু ইতিহাস বলে সেটা ক্ষণস্থায়ী।
একসময়
ভালো মানুষের বিজয় হবেই হবে।
এবং
সে কারণেই
সমাজ-রাষ্ট্র-বিশ্ব থেকে
কখনোই ভালো মানুষ হারিয়ে যাবেনা।

Leave a Reply